গণহত্যায় সু চি ও সেনাপ্রধান দায়ী

  কূটনৈতিক প্রতিবেদক

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতীকী বিচারে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন এবং গণহত্যার দায়ে অং সান সু চি সরকার ও দেশটির সেনাবাহিনীকে দোষি সাব্যস্ত করেছে একটি আন্তর্জাতিক গণআদালত। এটিকে অবশ্যই ‘যুদ্ধাপরাধ’ অভিহিত করে গতকাল শুক্রবার এ ইস্যুতে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে মালায়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বিচারক ড্যানিয়েল ফেইয়ারস্টেইনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বেঞ্চ এ রায় দেন।

রোমভিত্তিক এই আদালতের নাম পার্লামেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল (পিপিটি)। বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ব্যাপকহারে যুদ্ধাপরাধ করে। তখন ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য যে ধারণা দিয়েছিলেন, তার প্রেক্ষাপটেই পিপিটি প্রতিষ্ঠিত। এ আদালত মূলত যুদ্ধাপরাধের শিকার মানুষের ভাষ্য তুলে ধরে বিশ্ব পরিম-লে।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলারসের সাবেক প্রেসিডেন্ট আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল ফেইয়ারস্টেইন ওই বিচারক প্যানেলের সভাপতি। অন্যরা হলেনÑ মালয়েশিয়ার জুলাইহা ইসমাইল, কম্বোডিয়ার আইনবিদ হেলেন জার্ভিস, অস্ট্রেলিয়ার সিডনির মেকুইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক প্রধান গ্রিল এইচ বোয়েরিঙ্গার, ইন্দোনেশিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী নুরসিয়াবানি কাতজাসুংকানা, ইরানের মানবাধিকার আইনজীবী সাদি সদর ও ইতালির সুপ্রিমকোর্ট অব ক্যাসেসনের বর্তমান সলিসিটর জেনারেল নিলো রেসি।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, কোচিন এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলমান হত্যাকা-ের ঘটনায় বিশেষ এই আদালতের শুনানিতে বলা হয়Ñ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের অফিসিয়াল দায়িত্ব পালনের কথা বলে ‘রোহিঙ্গা মুসলিম জনগণকে কৌশলগত লক্ষ্যে’ পরিণত করে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, আর এটি অবশ্যই যুদ্ধাপরাধ।

শুনানির পর রায়ে বলা হয়, উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ বিষয়ে একমত হওয়া যায় যে, মিয়ানমার সরকার তাদের কোচিন ও মুসলিম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের জনগণের ওপর ‘গণহত্যা’র প্রয়াস নিয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। এমনকি মিয়ানমার তার মুসলিম নৃগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর অপরাধে দোষী।

রায়ের ওপর ভিত্তি করে ১৭টি প্রস্তাবনাও দিয়েছে আন্তর্জাতিক গণআদালত। রায়ের পর প্রস্তাবনাগুলো পড়ে শোনান বিচারক গ্রিল এইচ বোয়েরিঙ্গার।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলকে ভিসা ও অবাধে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই দেশটির সংবিধান সংশোধন করতে হবে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নাগরিকত্ব দিয়ে সব পক্ষপাতমূলক আইন প্রত্যাহার করতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মতো যেসব দেশ পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের আর্থিক সাহায্য দিতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।

গণআদালতের সুপারিশগুলো হলোÑ ১. মিয়ানামার সরকার এবং আসিয়ান প্রতিনিধিরা রাখাইনের সব সশস্ত্র গ্রুপকে নিয়ে রাখাইন সীমান্ত বরাবর অঞ্চলের বেসামরিকীকরণ এবং একটি অস্ত্রবিরতির প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা শুরু করবেন; ২. অং সান সু চির ঘোষিত ‘যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায়’ রোহিঙ্গাসহ সব গোষ্ঠীকে পূর্ণ নাগরিকত্ব দিতে হবে; ৩. জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থাকে রাখাইনের ঘটনা তদন্তের অনুমতি দিতে হবে; ৪. মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গা, কোচিন ও অন্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি তার বৈষম্যমূলক নীতি পরিহার করতে হবে; ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিলসহ ২০০৮ সালের সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে; ৫. মিয়ানমারের পার্লামেন্টে সামরিক প্রতিনিধির কোটা বাতিল করতে হবে; ৬. সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশকে পূর্ণ বেসামরিক নিয়ন্ত্রণে আনতে সংবিধানে নিশ্চয়তা থাকতে হবে; ৭. মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের দায়মুক্তি বন্ধ করে দোষী ব্যক্তিদের বিচার শুরু করতে হবে; ৮. বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন এবং তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানে একটি স্বাধীন বেসরকারি কমিশন গঠন করতে হবে; ৯. একটি ফেডারেল কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী যে তাদের নিজেদের স্বায়ত্তশাসন নিজেরাই নিশ্চিত করার সামর্থ্য রাখে, সেটি স্বীকার করতে হবে; ১০. প্রতিবেশী দেশ, মানবাধিকার, ধর্মীয় সংগঠন ও সাংবাদিকদের রাখাইন প্রদেশ, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুসহ কোচিন ও অন্য গোষ্ঠীগুলোর এলাকার ভিসা এবং অবাধে প্রবেশাধিকার দিতে হবে; ১১. উদ্বাস্তু প্রবাহকে নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখার একটি প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু সেটি শুধু ত্রুটিপূর্ণ তা-ই নয়, এটি ভ্রান্তনীতি অনুসরণে উৎসাহিত করতে পারে; ১২. অভিবাসন সংকট যেটি দেখা দিয়েছে, তার দায়ভার আসিয়ান দেশগুলোকে নিতে হবে। আসিয়ান সনদ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের সীমান্ত খুলে দিতে হবে; ১৩. বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য জাতিÑ যারা রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানিয়েছে, তাদের আর্থিক ও সহায়তা দিতে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও চীনের মতো সম্পদশালীদের এগিয়ে আসতে হবে; ১৪. স্বাগত জানানো দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আবার একই সঙ্গে মানবপাচারকারীদের বিপদ থেকে বাঁচতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করতে হবে; ১৫. মিয়ানমারের সরকারের ওপর আশু অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে; ১৬. মিয়ানমার সরকারের কর্মকর্তাদের ওপর টার্গেটেড নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে; ১৭. এ রকম ঘটনার কারণ সম্পর্কে যা বিশ্বের জানা ছিল না, তা জানতে এবং সমস্যার কারণ চিহ্নিত করতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বেসরকারি কমিশন গঠন করতে হবে।

প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, বিভিন্ন প্রামাণ্য দলিল ও সাক্ষ্যগ্রহণের ভিত্তিতে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ মিলনায়তনে ১৮ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গণহত্যা বন্ধ করতে ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য মিয়ানমার সরকারকে চাপ দিতে এখন এই রায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে জাতিসংঘে পাঠানো হবে। তবে এই রায় বাস্তবায়নের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে