একটি যৌক্তিক প্রত্যাশা

  লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জগলুল আহসান

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:৫০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একুশ বাঙালির ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবের দিন। একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পটভূমিই ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সফলতা। বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশে একুশে ফেব্রুয়ারির অবদান তাই ভাষার গ-ি ছাড়িয়ে স্থান করে নেয় অনন্য এক সামগ্রিকতায়। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার ভিতর দিয়ে বাঙালি জাতির এ গৌরবগাথা ছড়িয়ে যায় বিশ্বজনীন পর্যায়ে। জাতি এ দিনটিকে মহান শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে। বিশেষ দিন উপলক্ষে ভাষা আন্দোলন, ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, গবেষণা প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একুশে পদকও প্রদান করা হয়।

ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এদিন ১ম ইস্ট বেঙ্গল বেজিমেন্টের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খান বাঙালি সেনা সদস্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন ‘ঋৎড়স হড়ি ড়হধিৎফং ইবহমধষর ঝড়ষফরবৎং রিষষ ংঢ়বধশ রহ টৎফঁ ধহফ হড়ঃ রহ ইবহমধষর’. আইয়ুব খানের এ বক্তব্যে বাঙালি সেনা অফিসার মেজর হোসেন পশ্চিম পাকিস্তানের পাঠান সৈনিকদের পশতু ও উর্দু বলার উদাহরণ দিয়ে বাঙালি সেনাদেরও বাংলা ও উর্দুতে কথা বলার দাবি জানান। আইয়ুব খান রাগান্বিত হয়ে তাকে বসিয়ে দেন। এ সময় তৎকালীন ক্যাপ্টেন গনি (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা) আবেগ জড়িত কণ্ঠে আইয়ুব খানকে বলেন, ‘ঊীপঁংব সব ঝরৎ, যিধঃবাবৎ গধলড়ৎ গ ও ঐড়ংংধরহ যধং ংধরফ রং হড়ঃ পড়ৎৎবপঃ. ডব ইবহমধষর ংড়ষফরবৎং রিষষ হবাবৎ ংঢ়বধশ রহ টৎফঁ নঁঃ রহ ড়ঁৎ সড়ঃযবৎ ঃড়হমঁব ইবহমধষর.’ জবাবে আইয়ুব খান তাকেও বসতে বলেন এবং কয়েকদিন পর একটি লিখিত আদেশে বাঙালি অফিসার, জেসিও এবং সৈনিকদের বাংলায় কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। মেজর হোসেন, ক্যাপ্টেন গনি এবং আরো অনেক বাঙালি সেনা সদস্য এ আদেশ অমান্য করে পেশাগত প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হন। কাজেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের এক প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় অংশীদার।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা এ দেশের আপামর জনতারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীনতাপূর্বকালে বাংলা ভাষাকে অবদমনের চক্রান্ত দেশের অন্য সব নাগরিকের মতো তাদেরকেও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করে। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবহিনীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ভিতর দিয়ে। এ যুদ্ধে তৎকালীন সেনাবহিনীর বাঙালি ইউনিট এবং বাঙালি সেনা সদস্যরাই প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অসীম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সংগঠিত হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে সামরিক নেতৃত্ব প্রদান করে।

২০০২ সালে সিয়েরালিওনের সংসদে বাংলা ভাষাকে ওই দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা (অনারারি) হিসেবে ঘোষণা প্রদান করা হয়। এ সম্মান সিয়েরালিওনের গৃহযুদ্ধ দমন ও পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সেনাবহিনীর অসামান্য পরিশ্রমের জন্য সে দেশের জনগনের স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতি বাংলা ভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরল অবদান যার কৃতিত্ব বাংলাদেশ সেনাবহিনীর । বিশ্বে এ রকম দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ নেই।

দেশে মান সম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও পরিচালনায় আমাদের সেনাবহিনীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এবং ক্যাডেট কলেজের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন যাবৎ দেশে মানস¤পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার উদাহরণ হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সাম্প্রতিককালে মিলিটারি স্কুল অব সায়ে›স অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল, মেডিক্যাল কলেজ, টেকনিক্যাল কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান ব্যাপক পরিসরে বৃদ্ধি পেয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন থেকেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমানে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রভৃতি দায়িত্বে নিয়োজিত হয়ে পরোক্ষভাবেও সেনাবাহিনী অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করছে ।

জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য প্রতিবছর আমাদের দেশে একুশে পদক প্রদান করা হয়। বেসামরিক পরিম-লে এ পদক দ্বিতীয় বৃহত্তম পুরস্কার। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে এ জারিকৃত একুশে পদকের নীতিমালা অনুযায়ী ভাষা আন্দোলন, শিল্পকলা, মুক্তিযুদ্ধ, সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষা, অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সমাজসেবা, রাজনীতি, ভাষা ও সাহিত্য এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত যে কোনো ক্ষেত্রে অবদানের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাকে এ পদক প্রদানের বিধান রয়েছে। ১৯৭৬ সালে প্রবর্তনের পর এ পর্যন্ত সর্বমোট ৪৬৮ জনকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। এ বছরও মোট ১৭ জনকে প্রধানমন্ত্রী গত ২০ ফেব্রুয়ারি ওসমানী মিলনায়তনে এ পুরস্কার বিতরণ করেছেন। যারা এ যাবৎ পুরস্কার পেয়েছেন তাদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত।

তবে একুশে পদক প্রাপ্তির ক্ষেত্রসমূহ বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে, ন্যূনতম পাঁচটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। প্রথমত বাংলা ভাষাকে দমনের চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ, দ্বিতীয়ত বাংলাকে সিয়েরালিয়নের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ভিতর দিয়ে বাংলা ভাষার বিকাশে সহায়তা, তৃতীয়ত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, চতুর্থত শিক্ষার মান উন্নয়নে অবদান এবং পঞ্চমত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা। উপরোল্লিখিত ক্ষেত্রসমূহে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতির কাছে আগামীদিনে একুশে পদক প্রত্যাশা করে।

য় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জগলুল আহসান : পিএসসি, জি, আর্টিলারি

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে