মেধা ও মনন বিকাশের জন্য পদক্ষেপ প্রয়োজন

  রায়হান আহমেদ

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:২৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

মেধা এমন সম্পদ, যার কোনো মরণ নেই। এটি এমন অস্ত্র যার আঘাত প্রতিহত করার ক্ষমতা নেই কারো। মেধা কোনো দল-মতের সম্পত্তি নয়, এটা গোটা দেশ, জাতি ও বিশ্বের সম্পদ। বিকাশ করার জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। তার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কবি সুকান্ত তাই বলেছিলেন, ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান।’ চীন, উত্তর কোরিয়াসহ বিশ্বের জনবহুল দেশগুলো জনসংখ্যার ভারে তলিয়েও যায়নি বা তারা পিছিয়েও পড়েনি। বরং তারাই আজ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। জনসংখ্যাকে তারা সমস্যা নয়, সম্পদ মনে করে কাজে লাগিয়েছে। ইটা কারিনের মতো নক্ষত্রব্যবস্থা আবিষ্কার করে জ্যোতির্বিদ্যার জগতে হইচই ফেলে দিয়েছে নাসার তরুণ বাংলাদেশি গবেষক ড. রুবাব খানের নেতৃত্বাধীন গবেষণা টিম। সূর্যের চেয়ে কয়েকশ গুণ বড়, পাঁচ জোড়া নক্ষত্র আবিষ্কার করেছে নাসার এই বিশেষ টিম। আর এর নেতা নাসায় কর্মরত তরুণ বাংলাদেশি গবেষক ড. রুবাব খান (২৯) যুক্তরাষ্ট্রেই উচ্চতর পড়াশোনা সম্পন্ন করে কাজ শুরু করেছিলেন নাসায়। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত নাসার গডার্ড স্পেস ফাইটের এক গবেষক টিমের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরেই ড. রুবাব খানের নেতৃত্বাধীন গবেষকরা মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ইটা কারিনের মতো নক্ষত্রব্যবস্থার খোঁজে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। নাসার স্পিটলার ও হাবল টেলিস্কোপের তথ্য নিয়ে গবেষণা করে অবশেষে তারা খোঁজ পান ইটা কারিনের মতো পাঁচ জোড়া নত্রের। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির বার্ষিক বৈঠকে রুবাব খান তাদের আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করার পর পুরো বৈঠকে চাঞ্চল্য দেখা যায়।

একটা মেধা ঝরে পড়া একটা সমাজ বা দেশের জন্য কতটা দুঃখজনক তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। কারণ কেউ জানত না যে, করমচাঁদ গান্ধি (মহাত্মা গান্ধী) তার মতো একজন সাধারণ মানুষ গোটা ভারতের স্বাধীনতার জন্য অবদান রাখবেন। কে জানত গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া শেখ মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু) সেই ছেলেটাই হবে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার মধ্যমণি। কে জানত বিকলাঙ্গ হয়েও স্টিফেন হকিং বর্তমান শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী হবেন?

আব্রাহাম লিংকনের মতো একজন মানুষ হবে আমেরিকার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ শাসক কে জানত? বারাক ওবামার মতো কৃষ্ণাঙ্গ, গরিব পরিবারের ছেলে আমেরিকার নক্ষত্রতুল্য প্রেসিডেন্ট হবে এটা কেউ জানত না। হিটলারের মতো রাস্তার ছেলে হয়ে উঠবে বিশ্বসেরা ইতিহাস রচনার উপাদানসম খলনায়ক, এটা কে জানত? কে জানত নরেন্দ্র মোদির মতো একজন চা বিক্রেতার ছেলে হবে ভারতের মতো এত বড় দেশের প্রধানমন্ত্রী। নেলসন ম্যান্ডেলার মতো একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠবে বর্ণবৈষম্যহীন সমাজের প্রতিষ্ঠাতাÑ কে জানত? এ রকম শত উদাহরণ রয়েছে ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্রসম ব্যক্তিত্বের। তাদের উঠে আসার গল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রতিভার বিকাশ কতটা জরুরি একটা সমাজ-দেশ-জাতির আমূল পরিবর্তনের জন্য। মাতৃগর্ভের শিশু হিটলারও হতে পারে আবার বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী। কোনো শিশু মায়ের পেট থেকে নিউটন হয়ে জন্মায় না, তাকে নিউটন হওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়। শিশু কাদামাটি, তাকে সুন্দর শিল্প হিসেবেও গড়া যায়, আবার তামাক খাওয়ার কলকিও বানানো যায়। তার জন্য প্রয়োজন সুযোগ, প্রয়োজন সুন্দর অনুকূল পরিবেশ। মাদার তেরেসা একবারই পৃথিবীতে আসবে এমন নয়। প্রত্যেক মেয়েই মাদার তেরেসার মতো হতে পারে, হতে পারে শিরিন এবাদির মতো বিশ্ব শান্তির দূত। যে কোনো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সব ধরনের জনবল, যারা একটা রাষ্ট্রকে সব দিক থেকে পরিপূর্ণ করে তুলবে। প্রয়োজন একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক; মোট কথা মানবসভ্যতার উন্নয়নের জন্য যে ধরনের মহাপুরুষ দরকার।

স্রষ্টা তার অপার করুণায় আমাদের মাঝে সব ধরনের প্রতিভাসম্পন্ন মানুষ দিয়েছেন। কথায় বলে ‘ইচ্ছা থাকলে সমুদ্রের তলার স্বর্ণ নাকে উঠে আর ইচ্ছ না থাকলে নাকের স্বর্ণ সমুদ্রতলে ঢোবে। আমাদের যদি ভাবনা হয় বিশ্বকে নিজের দেশ-জাতি-সমাজকে আদর্শরূপে গড়ে তুলব তা হলে স্রষ্টাপ্রদত্ত এই মহাপুরুষের সেবা করতে হবে। মেধা ও মনন বিকাশের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে। ‘যতনে বাড়ে রতন’ কথাটা সামান্য একটা প্রবাদ হলেও এর অর্থমূল্য অনেক। আজকের স্টেশনে গান করা শিশুটির জন্য সুযোগ করে দিতে পারলে আমরা হয়তো মাইকেল জ্যাকসনের মতো বা তার চেয়ে বড় তারকা পেতাম। ঘরের মাঠের ফুটবল খেলা ছোট ছেলেটা হয়তো হতে পারত পেলে-ম্যারাডোনা-মেসির মতো বিশ্বখ্যাত তারকা ফুটবলার। অনেক মুস্তাফিজ, মাশরাফি আজও পড়ে আছে গ্রামবাংলার অজানা প্রান্তরে। জয়নুল আবেদিন বা কামরুল হাসানের মতো অনেক চিত্রকর লুকিয়ে আছে বাংলার ঘরে। সামান্য সুযোগ হয়তো তাদের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। বাংলাদেশের মাটিতে আইনস্টাইন জন্ম নেবে না বা নিউটন হবে না কোনো বিধান নেই। মায়ের কোলের ছোট সেই খোকাই যে একদিন বিশ্ব রতœ হবে এটা তার মা নিজেও জানত না।

মেধা এমন সম্পদ যার কোনো মরণ নেই। এটি এমন অস্ত্র যার আঘাত প্রতিহত করার ক্ষমতা নেই। যার দ্বারা বিশ্বে রাজত্ব করা যায়। মেধা কোনো দল-মতের সম্পত্তি নয়, এটা গোটা দেশ-জাতি ও বিশ্বের সম্পদ। বিকাশ করার জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। করতে হবে তার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি। কবি সুকান্ত বুঝতে পেরেই বলেছিলেন, শিশুর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে। চীন, উত্তর কোরিয়াসহ বিশ্বের জনবহুল দেশগুলো জনসংখ্যার ভারে তলিয়েও যায়নি বা তারা পিছিয়েও পড়েনি। বরং তারাই আজ বিশ্বে রাজত্ব করছে। জনসংখ্যাকে তারা সমস্যা নয়, সম্পদ মনে করে কাজে লাগিয়েছে। আমাদের দেশে রয়েছে চীন, উত্তর কোরিয়ার মতো উন্নয়নের সুযোগ। কারণ আমাদের সোনার খনি নেই তবে আমাদের দেশে সোনা ফলে।

আমাদের পরিবার-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ-দেশ কেউই জানতে চায় না শিশুমনের ভাবনাটা কী? তার ইচ্ছা কী? সে কী হতে চায়? সুযোগ করে দিতে পারি না তার সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের। তাই এ ব্যাপারে সরকারসহ সবার মনোযোগ আকর্ষণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ড. রুবাব খানের জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে রাজধানী ঢাকায়। এখানকার উদয়ন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে নটর ডেম কলেজ থেকে পাস করেন এইচএসসি ২০০৪ সালে। তিনি পদার্থবিদ্যার বিশেষ শাখা অ্যাস্ট্রোফিজিকসে পড়াশোনার জন্য কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি পান। ২০০৮ সালে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পরে ২০১৪ সালে আমেরিকার ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন রুবাব খান। তার মতো আরও অনেক প্রতিভাসম্পন্ন বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী রয়েছেন, যারা প্রতিভা বিকাশের সুযোগের অভাবে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারছেন না। অথচ এখান থেকে বিদেশে গিয়ে অনেকেই আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাফল্য লাভ করেছেন। বিশ্বখ্যাত স্থপতি মরহুম এফ আর খানের কথা কে-ই বা না জানে। বাংলাদেশে শিক্ষার যথাযথ মান এবং গবেষণার জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব ও বাজেট দেওয়া হলে এসব প্রতিশ্রুতিশীল ছেলেমেয়ে দেশের জন্য, বিশ্বের জন্য অনেক অবদান রাখতে পারত। কিন্তু হানাহানির রাজনীতি আর দলান্ধতা দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জাতীয় নেতৃত্বকে ভেবে দেখার অবকাশ কমই দিচ্ছে। রাজনীতি আর ক্ষমতার স্বার্থে দেশে এমন এক অসহিষ্ণু পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে, যা শান্তি, স্থিতি, অগ্রগতি এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন-আবিষ্কারের জন্য মোটেই অনুকূল নয়। এ কারণেই এক সময়ের বিশ্বখ্যাত মসলিনের দেশ হওয়ার পরও সব উন্নত প্রযুক্তির জন্য আজও বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছি আমরা। জ্ঞান-বিজ্ঞান গবেষণার এ ধরনের অবরুদ্ধতাকে ছিন্ন করে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ অবশ্যই তৈরি করতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। কিন্তু এতই দুর্ভাগা আমরা, এদের জন্য ন্যূনতম কোনো সুযোগ তো দূরের কথা, দুই বেলা খাবার ব্যবস্থা করতে পারি না। এ রকম অনেক বিষয় রয়েছে, যেমনÑ যারা রাজনীতিতে অন্যদের থেকে বেশ প্রতিভাসম্পন্ন কিন্তু তারা কোনো অনুকূল পরিবেশ পায় না। যদি পেত তারা হয়তো দেশকে নতুনভাবে গড়ার মতো কিছু দিতে পারত। কিন্তু আমরা তাদের সে রকম পরিচর্যা দিতে পারি না। এটা আমাদের ব্যর্থতা।

য় রায়হান আহমেদ : কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে