অদক্ষতার কারণে পিছিয়ে বাংলাদেশ

৯০ শতাংশ শ্রমিক অদক্ষ সম্ভাবনাময় ১০ খাতের

  গোলাম রাব্বানী

১৫ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৮, ০৮:৫৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে বর্তমানে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনসংখ্যার আধিক্য। যখন কোনো দেশে এই কর্মক্ষম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি থাকে, তখন ওই দেশ ডেমোগ্রাফিক বোনাসকালে অবস্থান করছে বলে ধরা হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশ ২০১৪ সালে জনসংখ্যার বোনাসকালে প্রবেশ করেছে। কিন্তু যথাযথ কারিগরি জ্ঞান ও অদক্ষতার কারণে এই জনসম্পদের পুরোটা ব্যবহার করা হচ্ছে না।

বর্তমানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। আর কর্মক্ষম লোকের মধ্যে ৪ কোটি ১৭ লাখ বেকার রয়েছে। এ অবস্থায় যুবকদের শক্তি উৎপাদনশীল কাজে না লাগালে বা লাগাতে ব্যর্থ হলে তা ধ্বংসাত্মক পথে ধাবিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা। মানসম্মত ও বাজারমুখী শিক্ষার ব্যর্থতা এবং কারিগরি জ্ঞানের অভাবই এই বেকারত্বের কারণ বলেও মন্তব্য করেন তারা। এ ছাড়া সম্ভাবনাময় ১০টি খাতের ৯০ শতাংশ শ্রমিকের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। এ ছাড়া বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে ১২.৯ শতাংশ লোক। যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশেরই কোনো ধরনের কাজের যোগ্যতা বা দক্ষতা নেই।

এ ছাড়া দেশে ব্যাংকিং খাতে অদক্ষতায় বছরে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের সমান। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) এক অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক সরাসরি পোশাক খাতের সঙ্গে জড়িত। এ খাতের বেশিরভাগ শ্রমিকই অদক্ষ অবস্থায় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। আর এ কারণে পোশাক খাত এখনো কাক্সিক্ষত আকারের প্রবৃদ্ধি করতে পারছে না।

বিকেএমইএর সহসভাপতি এহসান শামীম বলেন, বর্তমানে পোশাক শিল্পে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শ্রমিক সংকট রয়েছে। যার কারণে দক্ষতা ছাড়াই পোশাক শ্রমিক নিয়োগ দিতে এক প্রকার বাধ্য হচ্ছি। তবে দক্ষ শ্রমিক থাকলে এ সমস্যায় পড়তে হতো না।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশে এখনো যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তা জিডিপির ৫ থেকে ৬ শতাংশের সমান। বর্তমানে শ্রমিকদের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ যেমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে না তেমনি সরকারিভাবেও এগুলো করা হয় না।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সব প্রতিষ্ঠানেরই চালু করা প্রয়োজন। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেও শ্রমিকরা বরাবরই উপেক্ষিত থাকে।

এ ছাড়া অদক্ষ জনগণ কাজের আশায় শহরমুখী হচ্ছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকায় ৭-৮ শতাংশ হারে মানুষের আগমন ঘটছে। ফলে প্রতিবছর প্রায় ১০-১২ লাখ মানুষ ঢাকা অভিমুখী হচ্ছে। বসবাসের যতই অযোগ্য হোক ঢাকায় আসা মানুষ ভালোভাবেই জানে উন্নয়ন বৈষম্যের কারণে ঢাকায় এমন কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা গ্রাম, জেলা শহরে এমনকি বিভাগীয় শহরেও পাওয়া যায় না। তাই দক্ষতার কোনো গ্রাহ্য না করে দলে দলে সবাই শহরমুখী হওয়ার দিকে ঝুঁকছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, সম্ভাবনাময় ১০টি খাতের ৯০ শতাংশ শ্রমিকের প্রশিক্ষণ নেই। গবেষণা প্রতিবেদনে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্মাণ, স্বাস্থ্য, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়াজাত, হালকা প্রকৌশল, তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও জাহাজ নির্মাণ শিল্প- এই ১০টি খাত পর্যালোচনা করা হয়েছে।

বিআইডিএসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সবচেয়ে বেশি অদক্ষ শ্রমিক রয়েছে চামড়া খাতে। এ খাতের ৯৫ শতাংশ শ্রমিকেরই প্রশিক্ষণ নেই। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ৯৩ শতাংশ শ্রমিক প্রশিক্ষিত নন। পোশাক খাতে মাত্র আট শতাংশ কর্মী প্রশিক্ষিত। বর্তমানে ৫০ লাখ কর্মী পোশাক শিল্পে সরাসরি নিয়োজিত রয়েছেন, এর ৯০ শতাংশই নারী।

এ ছাড়া পর্যটন খাতে ৭৫ শতাংশ জনবলের প্রশিক্ষণ নেই। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৬০ শতাংশের প্রশিক্ষণ নেই। এ ছাড়া নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব যথাক্রমে ৯২, ৮৭ ও ৮৬ শতাংশ।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে