ভোটে না এলে কিছু করার নেই

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী # নির্বাচন সময়মতো হবে প্রশ্নফাঁস নতুন নয় দায়ও মন্ত্রীর নয় এমসিকিউ বন্ধ করে দেওয়া হবে

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:৪৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতির মামলায় দ-িত খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও যথাসময়ে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, কেউ নির্বাচন না করলে কারো কিছু করার নেই। বিএনপি গতবারও আসেনি। এবারও যদি না আসে, তা হলেও আমাদের কিছু করার নেই। সংবিধান অনুযায়ী সময় মতোই নির্বাচন হবে। ২০১৪ সালে এত তা-ব চালিয়েও যখন নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। ইতালি সফর শেষে গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে ইতালি সফর সংক্রান্ত বিষয়াবলী তুলে ধরার পাশাপাশি প্রায় এক ঘণ্টা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন শেখ হাসিনা। শুরুতে ইতালি সফরের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি দেশবাসীকে তিনটি সুখবর দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে কার্গো বিমান পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আগামী মার্চে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং ফোর জি যুগে বাংলাদেশের যাত্রা শুরুর কথা উল্লেখ করেন তিনি। প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য শেষ করে স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে রসিকতাচ্ছলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শেষ, এবার যাই তা হলে।’ তখন শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ভাষার মাসে ১৯৫২ সালে নিহত ভাষা শহীদদের স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবনের ব্যাংকোয়েট হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এ ছাড়া দর্শক সারিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে এইচ টি ইমাম, সাহার খাতুন, মাহবুব-উল আলম হানিফ, দীপু মনি, আবদুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারও যদি কোনো দল নির্বাচনে না আসে, তা হলে আমাদের কী করার আছে? কোন দল নির্বাচন করবে, কোন দল করবে নাÑ সেটা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত। কেউ যদি বলে নির্বাচন করতে দেব না, তা হলে সেটা গায়ের জোরের কথা। সময়মতো, সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে। সংবিধানে যেভাবে আছে, যারা জনগণের ওপর বিশ্বাস করে, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বিএনপি গায়ের জোরে বলতে পারে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। কারণ তাদের জন্মই হয়েছিল গায়ের জোরে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিল দুদক। আর আদালত রায় দিয়েছেন। সেখানে সরকারের কিছু করার নেই।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় তো আমি দিইনি, রায় দিয়েছেন আদালত। তাদের নিজেদের লোকেরাই তো মামলা দিয়েছেন। মামলা করেছে দুদক। দশ বছর এই মামলা চলেছে। যার কার্যদিবস প্রায় ২৬১ দিন। সেখানে ৮০ বারের বেশি সময় নেওয়া হয়েছে। তিনবার আদালত পরিবর্তন করা হয়েছে। সময় চাওয়া হয়েছে ১০৯ বার। মামলাটি যখন শুরু হয়, তখন রফিকুল হক সাহেব তার আইনজীবী ছিলেন। তখন রফিকুল হক বলেছিলেন, টাকা দিয়ে দেন, তা হলে আর মামলা থাকে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই টাকা এসেছিল এতিমদের জন্য। সেই টাকা এতিমরা আর চোখে দেখেনি। কত হাত ঘুরে এই টাকা তার কাছে চলে আসে। কোরআনেও শাস্তির কথা বলা আছে। এতিমের টাকা খেলে আদালত শাস্তি দেয়, আল্লাহও শাস্তি দেন।

বিএনপির গঠনতন্ত্র পরিবর্তন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষেত্রবিশেষে, ব্যক্তিবিশেষে দুর্নীতি করলে কোনো কথা হয় না। আদালত রায় দিয়েছেন। আদালতের রায়ের আগে বিএনপি নির্বাচন কমিশনে গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের জন্য গঠনতন্ত্র জমা দিয়েছে। তারা যখন একেকজনকে নিয়োগ করে, তখন দেখবেন গঠনতন্ত্রের ধার ধারে না। যাকে যখন খুশি পদ দিয়ে যাচ্ছে। যিনি চেয়ারপারসন, তার হাতে সব ক্ষমতা। যেটা আমার হাতে নেই। আওয়ামী লীগে কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে সব ক্ষমতা।

খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করায় সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বিএনপিতে কি একটি নেতাও নেই যাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা যেত? যিনি মুচলেকা দিয়ে দেশ ছেড়ে গেলেন, তাকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা হলো। যাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে এফবিআই তদন্ত করে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছিল। তাকেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা হলো। বিএনপিতে এখন খুব কর্মঠ নেতা দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কাউকে ভারপ্রাপ্ত করা গেল না? নাকি বিএনপির চেয়ারপারসনের দলের কারো ওপর ভরসা নেই, যাকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়া যায়? যারা কাজ করছেন, তারা কি এই পদ পাওয়ার যোগ্য নন?

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমাকে যখন জেলে নিয়ে গেল, আমি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জিল্লুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করলাম। আমি আমার বোনকেও করিনি, ছেলেকেও করিনি।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে আছেন শুধু দিতেই পারে। আর কেউ কেউ আছেন, শুধু নিতেই জানেন। আমরা দুই বোন, আমাদের একটা মাত্র বাড়ি। আমার বাবা সারা জীবন জনগণের জন্য কাজ করেছেন, ওই বাড়িটি তাই জনগণের জন্য দিয়ে দিয়েছি। আমরা ট্রাস্ট করে ১৭০০ থেকে ১৮০০ জনকে সহায়তা করি। এটা নিয়ে খুব একটা প্রচারও করি না। আর কেউ যদি এতিমের টাকা আসার পরও মায়া ত্যাগ করতে না পারে, তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।

নিজের জেল জীবনের স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমাকে শ্যাওলা ধরা একটি ভবনে রাখা হয়েছিল, খাট ছিল ভাঙা। তাকে রাখা হয়েছিল স্পিকারের বাড়িতে, তার সঙ্গে এই ফাতেমাকে দেওয়া হয়েছিল। এটা গোপন ছিল। ডিআইজি হায়দার (সামছুল হায়দার সিদ্দিকী) সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। নাজীমউদ্দীন রোডের আদালতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে গৃহপরিচারিকার বিষয়ে সরকারপ্রধান টিপ্পনী কেটে আরও বলেন, আদালত দিয়েছেন। বেশি কিছু তো দেওয়ার নেই, একজন মেইড সার্ভেন্ট দিয়েছেন। যদি আরও কিছু ডিমান্ড করে।

যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ফাঁসির রায় কার্যকরের সময় দেশের বাইরে থেকে অনেক ফোন পেলেও এবার খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে কোনো টেলিফোন পাননি বলে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এটি একটি ভালো লক্ষণ। দুর্নীতিবাজদের পক্ষে কেউ কিছু বলে না।

প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে এটা চলে আসছে। কখনো সামনে চলে আসে, কখনো আসে না। প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করে দেয়, আবার সমস্যাও তৈরি করে। পরীক্ষার আগের দিন তো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না। ফাঁস হয় পরীক্ষার ২০ মিনিট আগে। কার এমন ‘ফটোজেনিক মেমোরি’ আছে যে প্রশ্ন দেখে ২০ মিনিটে সবকিছু মুখস্থ করে লিখে ফেলে?

প্রশ্নপত্র ফাঁস বলে একটি সুর তুলে দেওয়া হচ্ছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা নিয়ে সুর তুলে একবার মন্ত্রী, সচিব আবার সরকারকে দায়ী করা হচ্ছে। দয়া করে একটু খুঁজে দিন, কে প্রশ্নফাঁস করল। তার শাস্তি দেব আমরা। মন্ত্রী-সচিবকে চলে যেতে হবে কেন? তারা তো এটা ফাঁস করে চলে আসেননি।

নতুন ডিজিটাল আইন সংক্রান্ত এক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাইবার ক্রাইম একটি বিরাট সমস্যা। এ দেশসহ সারা বিশ্বে এ সমস্যা আছে। কেউ যদি এমন অপরাধ করেন, তা হলে তার ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা হবে। ফৌজদারি আইন (সিআরপিসি) অনুযায়ী কেউ অপকর্ম না করলে সেখানে অপপ্রয়োগ কেন হবে।

রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরে আবাসন সুবিধা নির্মাণের কাজ চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বালুখালী-কুতুপালং এখন রোহিঙ্গারা আছে। তাদের জন্য একটি দ্বীপে ঘরবাড়ি করা হচ্ছে। যত দ্রুত পারা যায়, তাদের স্থানান্তর করা হবে। এ সময় তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিতে মিয়ানমার টালবাহানা করছে, এটা তাদের চরিত্র। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবেও চাপ আসছে। একবার যদি রোহিঙ্গারা যাওয়া শুরু করে তা হলে স্রোতের মতো চলে যাবে।

চালের দাম বৃদ্ধির জন্য সিন্ডিকেট ও গণমাধ্যমকে দুষলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, চালের দাম বাড়ানোয় মিডিয়ারও একটু অবদান আছে। ব্যবসায়ীরা যখন চালের দাম বাড়ায়, তখন আপনারা এটা প্রচার করেন। তাতে অন্য ব্যবসায়ীরা আরেকটু দাম বাড়িয়ে নেয়। চালের দাম সিন্ডিকেটের জন্যও বাড়ে, আবার মিডিয়ার প্রচারের জন্যও বাড়ে।

আগামী নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

আনসার সদস্যদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরে আগামী নির্বাচন জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আমরা যে কোনো মূল্যে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর। এ সময় তিনি অতীতের মতোই যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আনসার সদস্যদের একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। গতকাল গাজীপুরের সফিপুরে আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে বাহিনীর ৩৮তম জাতীয় সমাবেশে যোগ দিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসন্ন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে আনসার বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ভোটের অধিকার, জনগণের মৌলিক অধিকার। আমরা চাই, জনগণ যেন যথাযথভাবে তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।

বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শান্তি, শৃঙ্খলা রক্ষায় অশুভ শক্তিকে পরাহত করতে সততা, সাহস ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, জ¦ালাও-পোড়াও, অগ্নিসংযোগ, মানুষ হত্যা, সম্পদহানি করা জাতীয় উন্নতির পরিপন্থী। বাংলার মাটিতে জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসের স্থান হবে না। বিএনপি-জামায়াত জোট যখন রেললাইনে আগুন দিচ্ছিল, বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করছিল তখন আপনারা বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন, সে জন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী আনসার ও ভিডিপি একাডেমির ইয়াদ আলী প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছলে বাহিনীটির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শেখ পাশা হাবিব উদ্দিন তাকে স্বাগত জানান। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী একটি খোলা জিপে প্যারেড গ্রাউন্ড পরিদর্শন করেন এবং অনুষ্ঠান মঞ্চে দাঁড়িয়ে আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর চৌকস সদস্যদের অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে সেবা ও সাহসীকতার জন্য ১২৭ জন সদস্যদের মধ্যে ৫০ জন সদস্যকে নিজ হাতে ব্যাজ পরিয়ে দেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে