• অারও

এমপিওর শতকোটি টাকা তছরুপ

  এম এইচ রবিন

১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:৪০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অকৃতকার্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নিচ্ছে বোর্ড। পাবলিক পরীক্ষায় শূন্য পাস কিংবা শ্রেণিভিত্তিক ভর্তিতে কাক্সিক্ষতসংখ্যক শিক্ষার্থী নেই- এমন প্রতিষ্ঠানের এমপিও সুবিধা বাতিল করা হবে।

জানা গেছে, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি এবং সমমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারের শত-শত কোটি টাকা এমপিও (বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি বেতন-ভাতার অংশ) সুবিধা পাচ্ছে। অথচ নামমাত্র চলছে শত-শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান; হচ্ছে না লেখাপড়া; বোর্ড পরীক্ষাগুলোয় শতভাগ ফেল করে শিক্ষার্থীরা; মানসম্পন্ন পাঠ থেকে বঞ্চিত তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েও কেন এর সুফল পাবে না, বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে শিক্ষা প্রশাসনকে। গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে। প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় কত পাস, কত জিপিএ-৫Ñ এ ধরনের সংখ্যাতাত্তিক ফলে কোনো আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নই প্রকৃত অর্জন।

জানা গেছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার পর দেখা যায়, সারা দেশে ৯৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। গত বছর ৫৩টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছিল। সেই হিসাবে এবার শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৪০টি। শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর ও বরিশাল বোর্ডে দুটি করে; রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও দিনাজপুর বোর্ডে একটি করে; এবং মাদ্রাসা বোর্ডের ৮২টি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী। কাক্সিক্ষতসংখ্যক ভর্তিও নেই অনেক প্রতিষ্ঠানে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মাহাবুবুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, সরকার কোটি-কোটি টাকা এমপিও খাতে ব্যয় করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া হয় না। এভাবে নামকাওয়াস্তে চলতে পারে না। উদ্যোক্তা ও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল নন। এগুলোকে বলা চলে অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠান। এদের পেছনে সরকার যে বিনিয়োগ করে, সে ক্ষেত্রে এর জবাবদিহিও থাকা উচিত। সরকার সেদিকেই যাচ্ছে।

গত জুন মাসে উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তির পরও দেখা গেছে, সারা দেশে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ ভর্তি হয়নি। সদ্য ভর্তি সমাপ্ত হওয়া উচ্চ মাধ্যমিকে সারা দেশের ১৩৫টি কলেজ-মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। আরও এক হাজার ৩৮৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ দু-একজন করে ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে। কোনোটিতে দুয়েকজন, কোথাও সর্বোচ্চ ৫-১০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। এমপিও সুবিধা পাওয়ার শর্তে একটি ক্লাসে সর্বনিম্নœ ২৫ শিক্ষার্থী থাকার বাধ্যকতা রয়েছে।

শূন্য ভর্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে কাজ করছে শিক্ষা প্রশাসন। তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডকে নির্দেশ পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তথ্য পাওয়ার পর এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের ফল ভালো হচ্ছে না, ভর্তিতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ নেই, আসন শূন্য থাকে, সেসবের কারণ হচ্ছে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখাপড়া হয় না। শিক্ষার মান নিশ্চিত করা হয় না বলেই এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহী নয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান রেখে কোনো লাভ নেই। কিছু কলেজের ব্যাপারে একটাই সিদ্ধান্তÑ তা হলো, বন্ধ করে দেওয়া। গত বছরও আমরা এ ধরনের কলেজ বন্ধ করে দিয়েছি। তিনি বলেন, এটা পরিষ্কার যে, এসব কলেজে সরকার যে এমপিও দেয়, তা অপচয়ের শামিল। এজন্য এমপিওভুক্তগুলো চিহ্নিত করা দরকার। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে এমপিও সুবিধা বাতিল করা হবে। বছরের পর বছর সরকার শতকোটি টাকা এমপিও দেবে, আর লেখাপড়া হবে নাÑ এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।

শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের আমলে মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষার ফলাফলে সাফল্যের সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ২০০৯ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭০.৮৯ শতাংশ। পরের বছর ২০১০ সালে ৭৯.৯৮ শতাংশ। ২০১১ সালে ৮২.৩১ শতাংশ। ২০১২ সালে ৮৬.৩৭ শতাংশ। ২০১৩ সালে ৮৯.০৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে পাসের হার ছিল ৯১.৩৪ শতাংশ। যা ২০১৫ সালে নেমে যায় ৮৭.০৪ শতাংশে। ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত ধরা হয় ওই বছর বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিকে। পরের বছর ফল বিপর্যয় কাটিয়ে ফের সূচকের ঊর্ধ্বগতির পিরামিড গড়ে ওঠে ২০১৬ সালে ৮৮.২৯ শতাংশে। এ বছর সেই সাফল্যের সূচক নেমে দাঁড়ায় ৮০.৩৫ শতাংশে।

শিক্ষা গবেষক খায়রুল আলম মনির বলেন, পরীক্ষায় কত পাস, কত জিপিএ-৫- এ ধরনের সংখ্যাতাত্ত্বিক ফলে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নই প্রকৃত অর্জন। এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে। সরকার শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েও কেন এর সুফল পাবে নাÑ তা নিয়ে ভাবতে হবে।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, একজন শিক্ষার্থী যখন বোর্ডের পরীক্ষায় ফল খারাপ করে, তার মানসিক অবস্থা, পরিবারের যে ক্ষতি, তা ভুক্তভোগী ছাড়া উপলব্ধি করা যাবে না। এদের ভবিষ্যৎ ঠেলে দেওয়া হয় অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। এ ক্ষতি সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশের ৭২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। গত বছর এর সংখ্যা ছিল ২৫।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে